রবিবার ২৫শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

হুমকির মুখে বাংলা সংস্কৃতি

আশরাফুল ওয়াহিদ দুলাল   |   শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট

হুমকির মুখে বাংলা সংস্কৃতি

বাংলাদেশ আউল-বাউল-ফকিরের দেশ। এই আউল-বাউল-ফকিরদের জীবনদর্শন, গান ও সাধনার ছায়াতেই গড়ে উঠেছে আমাদের হাজার বছরের লালিত বাংলা সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির ইতিহাস আমাদের গর্বিত করে—সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি প্রজন্মে। এ কারণেই দেশ-বিদেশের বহু খ্যাতনামা গবেষক আজও বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করে চলেছেন।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বহমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতির রূপ বদলাবে—এটাই স্বাভাবিক। আধুনিকতার ছোঁয়ায় সংস্কৃতির নতুন উপস্থাপন কোনো দোষের নয়। কিন্তু আধুনিকতার নামে বাঙালি সংস্কৃতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর সামাজিক অপরাধ।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘কনটেন্ট’-এর নামে যে বিকৃত মানসিকতা ও নিম্নমানের উপস্থাপনা ছড়িয়ে পড়ছে, তা শুধু আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে না; একই সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি থেকেও দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব উপস্থাপনার মাধ্যমে বিভিন্ন গোষ্ঠী, সম্পর্ক ও সামাজিক শ্রেণিকে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে অপমান করা হচ্ছে।

বিশেষ করে প্রবাসে বেড়ে ওঠা ছেলে-মেয়েদের লক্ষ্য করে বাবা-মাকে নিয়ে হাস্যরসাত্মক নাটক, স্ত্রীকে নিয়ে অশালীন কৌতুক, আত্মীয়স্বজন ও দেশের পরিবেশ নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপন—এসব হয়তো সাময়িকভাবে কিছু মানুষের বিনোদনের খোরাক জোগায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হিসেবে নতুন প্রজন্মের মানসিক গঠনে আঘাত হানছে। এমনকি শারীরিক গঠন বা শারীরিক দুর্বলতাকেও নোংরা রসিকতার বিষয়বস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে, যা চরম অমানবিক।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—এই তথাকথিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা অভিনেতাদের অনেককে আবার ‘সংস্কৃতি ব্যবসায়ী’রা গর্বের সঙ্গে মঞ্চে তুলে ধরেন। এর ফলে নীরবে অপমানিত হতে হয় প্রকৃত অর্থে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহকদের।

এই অবক্ষয়ের জন্য প্রবাসে পরিচালিত বাংলা টেলিমিডিয়াগুলিও কম দায়ী নয়। অনেক মিডিয়া হাউস দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে সমাজের সামনে হাজির হয়। মনে হয়, তাদের কাছে ব্যবসায়িক মুনাফাই মুখ্য—সামাজিক দায়বদ্ধতা কিংবা সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা নয়।

একসময় মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠেই খবরের কাগজের অপেক্ষায় থাকত। প্রতিটি পত্রিকার লেখা মানুষের জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিধি বাড়াত। শিশু-কিশোর বিভাগ, খেলাধুলা, বিশ্বরাজনীতি, সাহিত্য ও বিনোদন—সবকিছুতেই ছিল ভারসাম্য ও মূল্যবোধ। কিন্তু আজকের অনলাইন পত্রিকাগুলো একদিকে যেমন মানুষের তথ্যের চাহিদা পূরণ করছে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই অপসংস্কৃতি ও গুজব ছড়িয়ে নিজেদের মান হারাচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে।

অনেকে নিজেকে সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন, কিন্তু বিকৃত সংস্কৃতি চর্চার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তারা নীরব থাকেন। কারণ, নিজের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এই আশঙ্কা। অথচ এই নীরবতাই অপসংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

আমরা যদি নিজেকে প্রশ্ন করি—আমরা কি সত্যিই আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধকে ভালোবাসি?—তাহলে উত্তর স্পষ্ট। যারা প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও সমাজপ্রেমী, তারা এসব অসুস্থ চর্চাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবেন।

বিদেশের মাটিতে আমাদের সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থানকে রক্ষা করতে হলে বাংলা মিডিয়াগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। শুধুমাত্র ব্যবসায়িক লাভ নয়, সমাজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রবাসে দায়িত্বশীল টেলিমিডিয়াগুলো যদি বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরত, তাহলে নতুন প্রজন্ম অন্তত আংশিকভাবে হলেও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায় নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারত।

সর্বোপরি, আমাদের—সাধারণ বাঙালিদের—এই অসুস্থ মানসিকতার কনটেন্ট ও তথাকথিত সাংস্কৃতিক আয়োজন থেকে দূরে থাকতে হবে এবং সময় থাকতে প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। সমাজের সচেতন মানুষ ও সংগঠকদের যদি এসব অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে বয়কট ও প্রতিরোধ শুরু না করেন, তবে প্রবাসে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা সংস্কৃতির স্বকীয়তা হারাতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

একটি ভাষার সংস্কৃতি হলো সেই ভাষাভাষী মানুষের জীবনব্যবস্থার প্রতিফলন—আচরণ, বিশ্বাস, জ্ঞান, শিল্পকলা, নীতি, আইন, প্রথা ও রীতিনীতির সমষ্টি। এখন প্রশ্ন হলো—আমরা কোন সংস্কৃতির চর্চা করে সমাজের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করতে চাই?

আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদের সংস্কৃতি রক্ষার দায়িত্ব নিই।
কারণ—আমার সংস্কৃতি, আমার অহংকার।

লেখক:
আশরাফুল ওয়াহিদ দুলাল
সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী

advertisement

Posted ১২:২৩ | শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫

Swadhindesh -স্বাধীনদেশ |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

Advisory Editor
Professor Abdul Quadir Saleh
Editor
Advocate Md Obaydul Kabir
This newspaper (Swadhindesh) run by Kabir Immigration Ltd
যোগাযোগ

Bangladesh Address : Moghbazar, Ramna, Dhaka -1217, Europe Office: 552A Coventry Road ( Rear Side Office), Small Heath, Birmingham, B10 0UN,

ফোন : 01798-669945, 07960656124

E-mail: news@swadhindesh.com, swadhindesh24@gmail.com