| রবিবার, ১২ জানুয়ারি ২০১৪ | প্রিন্ট
স্টাফ রিপোর্টার : পাঁচ বছর ধরে মন্ত্রী থাকাকালে তাদের নিয়ে ছিল বিরামহীন সমালোচনা। তবে মন্ত্রী হিসেবে ব্যর্থ এবং চরমভাবে সমালোচিত হলেও অজ্ঞাত কারণে সরকারের শীর্ষমহলে তাদের কদরের কোনো কমতি ছিল না। এরা হলেন মখা আলমগীর, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শফিক আহমেদ, সাহারা খাতুন, দীপু মনি, শামসুল হক টুকু, ফারুক খান, এ কে খন্দকার, আবদুল লতিফ বিশ্বাস, আবদুর রাজ্জাক, রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু, দিলীপ বড়ুয়া প্রমুখ।
তারা দাপটের সঙ্গে যেমন মন্ত্রিত্বগিরি করেছেন তেমনি দলের ভেতরেও ছড়ি ঘুরিয়েছেন অবলীলায়। কিন্তু বিতর্কিত দশম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করলে ছিটকে পড়েছেন তারা। গতকাল শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে ৪৯ জন শপথ নিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বঙ্গভবনে তাদের শপথবাক্য পড়ান। কী কারণে তারা বাদ পড়েছেন, তার কোনো ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলেও ধারণা করা হচ্ছে, অযোগ্যতা, দুর্নীতি, প্রগল্ভতাসহ নানা কারণে তারা বাদ পড়েছেন। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন , সামনে বৈরী আবহাওয়ার আশঙ্কা থাকায় তাদের নৌকায় তুলে নিলে তীরে ভেড়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
পূর্ববর্তী মহাজোট সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মখা আলমগীর বহু আগে থেকেই একজন চরম বিতর্কিত ব্যক্তি। মহাজোট সরকারের সময় তিনি নতুন একটি ব্যাংকের অন্যতম মালিক হয়ে যান। এতে তার দুর্নীতি নিয়ে বাতাস ভারী হয়। এছাড়া সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর সমালোচিত হন তিনি। বহু হতাহতের পর বিবিসিকে তিনি বলেছিলেন, বিরোধী দলের সমর্থক কিছু লোক ভবনটির গেট ও বিভিন্ন স্তম্ভ ধরে নাড়াচাড়া করেছিল। এ কারণেই ভবনটি ধসে পড়ে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার এ ধরনের কাণ্ডজ্ঞানবিবর্জিত বক্তব্যে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় বয়ে যায়। মখা আলমগীর আরও সমালোচিত হয়েছিলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে মারধর করা পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশিদকে রাষ্ট্রপতির পদক দেয়ার বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে। তিনি বলেছিলেন, তাকে পদক দেয়ার ক্ষেত্রে ওই ঘটনা বিবেচনায় আনা হয়েছে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আলোচনায় ছিলেন রেলের অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনা নিয়ে। মহাজোট সরকার গঠনের শুরুতে স্থান না পেলেও পরবর্তী সময়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। এর পরপরই তার গাড়িতে রেলে নিয়োগবাণিজ্যের ঘুষের ৭০ লাখ টাকা পাওয়া যায়। এ ঘটনার কারণে তিনি ব্যাপকভাবে নিন্দিত হন। তাকে কালোবিড়াল আখ্যা দেয়া হয়। কূটনৈতিক অর্জন কার্যত শূন্য হলেও বিদেশ সফরে বিশ্বরেকর্ড গড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির নির্বাচনকালীন সরকারেও ঠাঁই হয়নি। এবার নতুন মন্ত্রিসভা থেকেও তিনি বাদ পড়েছেন।
সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। তখন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের ধরার প্রতিশ্রুতি দিলেও এ নিয়ে নানা নাটকীয় ঘটনার খবর গণমাধ্যমে আসে। কিন্তু খুনিরা আর ধরা পড়েনি।
এক ঈদে রাজধানীতে চুরি-ডাকাতির পর পরের ঈদে সাহারা খাতুন বলেছিলেন, ঈদে ঘরে তালা দিয়ে বাড়ি যাবেন। তালাচাবি হিসেবে তার ওই বক্তব্য গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ আইনমন্ত্রী থাকাকালে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে বেআইনি কর্মকাণ্ডের মহোত্সব হয়েছে। পদে পদে সংবিধান লঙ্ঘন থেকে শুরু করে মানবাধিকবার লঙ্ঘনের ঘটনায় বাংলাদেশ বিশ্বসভায় চরমভাবে নিন্দিত হয়েছে। বিশেষ করে, উচ্চ আদালতকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবারই অভিযোগ করেছে। বিচারের নামে নিষ্ঠুর অবিচারের তামাশা চলেছে। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সারা বিশ্বে বাংলাদেশ কলঙ্কিত হয়েছে।বন ও পরিবেশমন্ত্রী হাছান মাহমুদের বিরুদ্ধে পাঁচ বছরে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে, যা তিনি বৈধ পথে অর্জন করেননি। তার বিরুদ্ধে জলবায়ু তহবিলের অর্থ তছরুফেরও ব্যাপক অভিযোগ আছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাকালে কর্নেল (অব.) ফারুক সিন্ডিকেট দমনে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হন। ফলে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে হুহু করে। অন্যদিকে তার পারিবারিক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ সরকারের লোভনীয় বহু কাজ ও লাইসেন্স হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ আছে। পরে বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী হিসেবেও তিনি নানাভাবে সমালোচিত হন।
পাঁচ বছরে পরিকল্পনামন্ত্রী থাকাকালে এ কে খন্দকার ছিলেন নিষ্প্রভ। তিনি মন্ত্রী হিসেবে যতটা না সক্রিয় ছিলেন, তার চেয়ে বেশি তত্পর ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কথিত চেতনার নামে বাম আদর্শ প্রতিষ্ঠায়। অনেক সময় আওয়ামী লীগের নীতিকৌশলেরও সমালোচনায় মুখর ছিলেন তিনি। এছাড়া রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু মন্ত্রী থাকাকালেই তার এলাকার জনপ্রিয় মেয়র লোকমান হোসেন খুন হন এবং এ খুনের সঙ্গে তার পরিবারের লোকজন জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
এক সময়ের কার্যত কপর্দকহীন সাম্যবাদী নেতা দিলীপ বড়ুয়া মন্ত্রী থাকাকালে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের জন্য নিয়েছেন একাধিক প্লট।এছাড়া বিতর্কিত স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আফসারুল আমীন, সমাজকল্যাণমন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ, পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন, গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান, বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মজিবুর রহমান ফকির, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, শিল্প প্রতিমন্ত্রী ওমর ফারুক চৌধুরী, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান, মত্স্য প্রতিমন্ত্রী আবদুল হাই, নির্বাচনকালীন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা, সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদও বাদ পড়েছেন।
দুর্নীতি ও অনিয়মের নানা অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়দের মধ্যে শেখ সেলিম, শেখ হেলাল ও শেখ ফজলে নূর তাপসও মন্ত্রিসভায় নেই।
Posted ১০:৫২ | রবিবার, ১২ জানুয়ারি ২০১৪
Swadhindesh -স্বাধীনদেশ | admin