| বুধবার, ০৮ জানুয়ারি ২০১৪ | প্রিন্ট
স্টাফ রিপোর্টার : অবশেষে মুখ খুললেন জাতীয় পার্টির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রথম স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ। গতকাল বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আমি পার্টির মুখপাত্র নই। তবুও গত দুই মাস ধরে আপনারা আমার বাড়ির সামনে দিনের অধিক সময় অবস্থান করেছেন। নানাভাবে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমি কিছুই বলিনি। এখন মনে হচ্ছে কিছু কথা আপনাদের জানানো দরকার। তিনি বলেন, আমরা আমাদের দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। তিনি সব সময়ই এ ব্যাপারে আমাদের উত্সাহ দিয়েছেন। তার শরীর খারাপ থাকায় বর্তমানে তিনি সিএমএইচে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। কিছু দিনের মধ্যেই ডাক্তার তাকে ছেড়ে দেবেন। তবে আগামীকাল (আজ) তিনি এমপি হিসেবে
শপথ নেবেন। তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিধায় সংসদীয় দলের নেতা বা বিরোধী দলীয় নেতা হবেন না। তিনি আমাকে সংসদীয় দলের নেতা বা বিরোধীদলীয় নেত্রী হওয়ার নির্দেশ নিয়েছেন।
সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়ার প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, কাজী ফিরোজ রশিদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। তবে সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য এইচ এম এরশাদের সহোদর জিএম কাদের উপস্থিত ছিলেন না।
উল্লেখ্য, মনোনয়নপত্র দাখিলের মাত্র একদিন পরেই গত ৩ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে নাটকীয়ভাবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, পতিত সামরিক স্বৈরাচারী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। একই এদিন তিনি তার দলের সব প্রার্থীকে অবিলম্বে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেন।
সংবাদ সম্মেলনে দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে এইচ এম এরশাদ বলেন, আমার সম্পর্কে বলা হয়, আমি নাকি এক হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। এটা সত্য নয়। টাকা নিয়ে থাকলে আজ আমি আজ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতাম না। উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা আমাকে বিদ্রূপ করো, বলো, এরশাদ সকালে এক কথা, বিকালে এক কথা বলেন। তোমাদের বুঝতে হবে—আমি না থাকলে দল চলে না। জেলে গেলে দলের অস্তিত্ব থাকে না। আমার দুর্বলতা আমি একজন বিকল্প চেয়ারম্যান তৈরি করতে পারিনি। আমাকে অনেক কিছু ভাবতে হয়। রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব দিলেই আমাকে মামলা-জুলুম থেকে নিস্তার দেয়া হতো। আমি শৃঙ্খলিত রাজনীতিবিদ। শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে বাঁচতে চাই।
এইচ এম এরশাদ বলেন, আওয়ামী লীগের বর্তমান যে অবস্থা তাতে দু’জন এরশাদকে দিয়েও তাদের ভরাডুবি ঠেকানো যাবে না। আমি বলেছিলাম, সব দল নির্বাচনে না গেলে আমি নির্বাচনে যাবো না। সেই সব দলের মধ্যে আমিও তো একজন। আমি ভেবেছিলাম কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতে হবে। তাই প্রথম এগিয়ে আসার দায়িত্বটা আমিই নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের অর্জন আসবে না। আসতে পারেও না। কারণ, গণতন্ত্রে ক্ষমতার রদবদলে একটাই পথ নির্বাচন। আমি সেই পথেই হেঁটেছিলাম। ভেবেছিলাম—আরও দল আমাকে অনুসরণ করবে। দুর্ভাগ্য আমার দুর্ভাগ্য গোটা জাতির, কোনো প্রত্যাশাই পূরণ হলো না।
এর পরদিন (৪ ডিসেম্বর) মন্ত্রিসভা থেকে দলের সদস্যদের পদত্যাগের নির্দেশ দেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। একই সঙ্গে তিনি আবারও দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। এদিন বিকালে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘তিনি (সুজাতা সিং) বলেছেন সঠিক সময়ে নির্বাচন হবে এবং এই সরকার পাঁচ বছর থাকবে। আপনি নির্বাচনে অংশ নিন। আপনি নির্বাচনে অংশ না নিলে উগ্রপন্থী জামায়াত ক্ষমতায় আসবে। এর উত্তরে আমি বলেছি, কে ক্ষমতায় আসবে তা আমি জানি না। তবে এটা যদি সত্যি হয় এর জন্য বর্তমান সরকারই দায়ী। এখন দেশের যে অবস্থা তাতে আমার পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেয়া সম্ভব না’।
এরশাদ বলেন, তিনি (সুজাতা সিং) বলেছেন, শেখ হাসিনার সরকার দেশের অনেক উন্নয়ন করেছে। ভালো ভালো কাজ করেছে। আপনি তার সঙ্গে থাকেন। এর জবাবে আমি বলেছি, তিনি (শেখ হাসিনা) কিছু উন্নয়ন করলেও রাজনীতিটা ভালো করেননি। তাই তার পক্ষে দেশের মানুষ নেই। দেশের মানুষ তাকে আর চায় না। এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে মাত্র দুই শতাংশ ভোট কাস্ট হবে। তাই জনমতকে উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের পক্ষে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না’।
তিনি বলেন, আমি বলেছিলাম সব দল নির্বাচনে অংশ না নিলে সেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না এবং ওই নির্বাচনে আমি যাবো না। আমি আমার ওয়াদা রক্ষা করেছি। জীবনের শেষ সময়ে এসে বেইমান হয়ে মরতে চাই না। আমি আবারও বলছি, আমি নির্বাচনে যাবো না, যাবো না, যাবো না—এটাই আমার শেষ কথা। এরপর এদিন বিকাল থেকে এইচ এম এরশাদের বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্ক (নিজ বাসভবন) ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ফলে এদিন রাতে তিনি আত্মহত্যার হুমকি দেন।
এরপর গত ৬ ডিসেম্বর এইচ এম এরশাদ একতফরা নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে এখনও অটল রয়েছেন বলে জানান। এদিন সকাল ১১টায় বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে (এরশাদের বাসভবন) সংবাদিকদের তিনি বলেন, আমার আত্মহত্যার কথাটি গণমাধ্যমে ভিন্নভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে আমাকে গ্রেফতার করার চেষ্টা করা হলে আমি আত্মহত্যা করবো। এটা ঠিক নয়। কারণ, আমি বহুবার গ্রেফতার হয়েছি। আবারও হতে পারি। এর জন্য সুইসাইড করতে হবে কেন? তিনি বলেন, আমি আশঙ্কা করেছিলাম জোর করে আমার স্টেটমেন্ট পরিবর্তন করানোর চেষ্টা করা হবে। এ প্রেক্ষিতে আমি বলেছিলাম জোর করে আমার মত পরিবর্তনে বাধ্য করা হলেই আমি আত্মহত্যার পথ বেছে নেবো। সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য যাতে কেউ চাপ না দেয় সে জন্যই আমি আত্মহত্যার কথা বলেছি।
এরপর গত ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সঙ্গে বৈঠকে এইচ এম এরশাদ একতরফা নির্বাচনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান। এর দুই দিন পর অর্থাত্ ১২ ডিসেম্বর গভীর রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এইচ এম এরশাদকে সিএমএইচ হাসপাতালে ভর্তি করে। এরপর এরশাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সৃষ্টি হয় নানা ধূম্রজাল।
তবে পরদিন (১৩ ডিসেম্বর) এইচ এম এরশাদ এক বিশেষ বার্তায় বলেন, ‘আমি অসুস্থ নই। আমাকে গ্রেফতারের জন্য এখানে আটকে রাখা হয়েছে। সর্বশেষ গত ২১ ডিসেম্বর এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী গত ১২ ডিসেম্বর গভীর রাতে এরশাদকে সিএমএইচ হাসপাতালে ভর্তি করার পর প্রায় প্রতিদিন জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশ নেয়া নিয়ে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা নানারকম বিভ্রান্তিকর কথা বলছেন। তবে দলের চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ এখনও নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। যদিও গতকালের সংবাদ সম্মেলনে রওশন এরশাদ জানালেন, জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে শুরু করে যাবতীয় কর্মকাণ্ড এরশাদের নির্দেশেই হচ্ছে।
Posted ১৬:১৯ | বুধবার, ০৮ জানুয়ারি ২০১৪
Swadhindesh -স্বাধীনদেশ | admin