| রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৩ | প্রিন্ট
মোহাম্মদ শরিফুল এসলাম

জুম’আ প্রসঙ্গে আল্লাহ মো’মেনদেরকে উদ্দেশ্য কোরে বোলেছেন, “হে মোমেনগণ! জুম’আর দিনে যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয় তখন ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ কোরে আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও” (সুরা জুম’আ ৯)। জুম’আর সালাহ কখন থেকে শুরু হোয়েছিল তা নিুচের দুটি বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়।
১) ইবনে ইসহাক বলেন, কা’ব ইবনে মালেক স্বীয় পুত্র আব্দুর রহমানকে বলেন, বৎস! আবু উমামা আস আদ ইবনে জুরারাই (রা:) প্রথম ব্যক্তি যিনি আমাদের নিয়ে মদীনায় জুম’আর সালাহ প্রতিষ্ঠা করেন। (ইবনে হিশাম (২য় খণ্ড), ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃ: ১০৭)
(২) রসুলাল্লাহ মক্কায় থাকা অবস্থাতেই তিনি মাস’আব ইবনে উমায়েরকে (রা:) জুম’আর দুই রাকাত সালাহ কায়েমের হুকুম দেন। (আদ দারুল মনসুর- ৬ষ্ট খণ্ড, পৃ: ২১৮, জুম’আ অধ্যায়)।
উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয়, রসুলাল্লাহ মক্কায় কোনদিন জুম’আ কায়েম করেন নি। কারণ মক্কায় রসুলাল্লাহর কোন কর্তত্ব ছিল না, সেখানে তাঁর পক্ষে আল্লাহর কোন আইন-কানুন ইত্যাদি বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল না। তিনি যখন মদীনায় হেজরত কোরে আসলেন, মদীনায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব (তওহীদ) প্রতিষ্ঠিত হোল, মদীনার আউস এবং খাজরাজ গোত্র রসুলাল্লাহকে শাসক হিসাবে মেনে নিলেন, তখন মসজিদে নববী কেন্দ্রীক জুম’আর সালাহর কার্যক্রম আরম্ভ হোল। রসুল খোতবার মাধ্যমে এসলামী হুকুমতের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও নীতি নির্ধারণী বক্তব্য রাখতেন এবং জুম’আর সালাহর পর যাবতীয় সমস্যার সমাধান কোরতেন, বিচার ফায়সালা, দণ্ড কার্য্যকর করা ইত্যাদি কাজ কোরতেন। রসুলাল্লাহর এন্তেকালের পর খোলাফায়ে রাশেদীনরাও একই নীতিতে জুম’আর সালাহ কায়েম কোরতেন এবং জুম’আর পর বিচার ফায়সালা ও দণ্ডবিধি কার্য্যকর করা হোত। এক কথায় মোসলেম জাহানের যাবতীয় কর্মকাণ্ড মসজিদ থেকেই পরিচালিত হোত। মসজিদই ছিল উম্মাহর প্রাণকেন্দ্র। সালাহ কায়েম করা ছাড়াও মসজিদ থেকেই প্রেরিত হোত সেনাবাহিনী, মসজিদেই খলিফার সাক্ষাৎ কোরতেন বিভিন্ন রাষ্ট্রের দূতগণ, জুম’আর দিনে মসজিদেই বোসত আদালত, সাজা দেওয়া হোত অপরাধীদের। প্রতি ওয়াক্তে নারী ও পুরুষ প্রায় সকলেই সালাতে অংশ নিত। মসজিদ ছিল প্রাণবন্ত, জীবন্ত। বর্ত্তমানের মসজিদে নামাজ পড়া ছাড়া আর কোন কাজ করা নিষেধ, এমন কি অনেক মসজিদে লেখা থাকে ‘মসজিদে দুনিয়াবি কথা বলা হারাম’। সেখানে অনেক স্থানে বোলতে গেলে মেয়েদের কোন প্রবেশাধিকার নেই। বর্তমানের মসজিদগুলি নিষ্প্রান, অধিকাংশ সময়েই গেটে তালা ঝুলানো থাকে। এর কারণ বর্তমানে এসলামের আকীদা বিকৃত হোয়ে যাওয়ার কারণে দীনের সকল কর্মকাণ্ডই শুধুমাত্র ব্যক্তিগত উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ কোরে ফেলা হোয়েছে, জাতীয় ও সামষ্টিক কোন কাজের সঙ্গেই তাই আজ আর মসজিদের কোন যোগসূত্র নেই।
অথচ আল্লাহ এই জাতিকে দিয়েছেন একটি পূর্ণাঙ্গ দীন। আল্লাহ বলেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের জীবনব্যবস্থাকে (দীন) পূর্ণ কোরে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামতকে পূর্ণ কোরে দিলাম। এবং এসলামকে তোমাদের জন্য জীবনব্যবস্থা হিসাবে মনোনীত কোরলাম (মায়েদা ৪)।
দীন শব্দের অর্থ জীবন-ব্যবস্থা, জীবন-বিধান। যে আইন-কানুন, নিয়ম দণ্ডবিধি মানুষের সমষ্টিগত, পারিবারিক, সামাজিক রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত জীবনকে নিয়ন্ত্রন কোরবে সেটারই একত্রিত, সামগ্রিক রূপ হোচ্ছে দীন। এ দীন আল্লাহর সৃষ্টও হোতে পারে, মানুষের মস্তিষ্ক প্রসূতও হোতে পারে, দু’টোই দীন। মানুষের মস্তিষ্ক প্রসূত যে দীন তা স্বভাবতঃই ভারসাম্যহীন, কারণ তা অতি সীমিত জ্ঞান থেকে তৈরী। আর আল্লাহ যে দীন সৃষ্টি কোরেছেন তা ভারসাম্যযুক্ত (কোর’আন- সূরা আল বাকারা ১৪৩)। মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, আইন দণ্ডবিধি ইত্যাদি মানুষের জীবনের সমষ্টিগত ও তার আত্মার যত রকমের প্রয়োজন তার সব কিছুরই একটা ভারসাম্যপূর্ণ মূল-নীতি নির্দেশনা।
এতে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ইত্যাদির যেমন অংশ আছে তেমনি আত্মার উন্নতির, পরিচ্ছন্নতারও অংশ আছে, দু’টোই আছে, এর যে কোন একটির গুরুত্ব কমিয়ে দিলেই আর সেই ভারসাম্য থাকবে না, তা আর দীনে ওয়াসাতা থাকবে না, তা আজকের এই বিকৃত এসলামের মত হোয়ে যাবে। যে কারণে আল্লাহর প্রতি মন-সংযোগ জামাতের সালাতের (নামাজ) চেয়ে নির্জনে অনেক বেশী হওয়া সত্ত্বেও ফরদ হোচ্ছে ঐ জামাতে যোগ দেওয়া, ঠিক সেই কারণে নির্জনে বোসে আল্লাহকে ডাকায় বেশী মন-সংযোগ, নিবিষ্টতা (ঈড়হপবহঃৎধঃরড়হ) হওয়া সত্ত্বেও আদেশ হোচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষের কোলাহলে, জনতার সাথে একত্র হোয়ে তার সামনে হাযির হওয়া। কারণ অন্যান্য বিকৃত ধর্মগুলির মত শেষ এসলামের উদ্দেশ্য শুধু একতরফা অর্থাৎ আত্মার ধোয়ামোছা, পরিষ্কার পবিত্রতা নয়। শেষ এসলামের প্রথম ও মুখ্য দিকটা হোচ্ছে জাতীয়, রাষ্ট্রীয়। ব্যক্তিগত দিকটা গৌণ যদিও ভারসাম্যযুক্ত। তাই ফরদ অর্থাৎ অবশ্যই করণীয়, যেটা না কোরলে চোলবে না, সেই ফরদ সালাহ কায়েমের আদেশ জামাতে, সবার সঙ্গে, হজ্ব করার আদেশ হোচ্ছে বিশাল জন সমাবেশে। আর নফল সালাহ ব্যক্তির ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হোয়েছে। এ থেকেই তো পরিষ্কার হোয়ে যায় যে এসলামে জাতীয় বিষয়ই প্রধান ও মুখ্য। ফরদ অর্থাৎ জাতীয় বিষয়গুলিকে বাদ দিয়ে নফল অর্থাৎ ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে থাকলে তা জায়েজ হবে না, যেমন জায়েজ হবে না ফরদ নামায বাদ দিয়ে রাত ভর নফল নামায পড়লে।
সালাহ যেমন জাতীয় ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্যযুক্ত হজ্বও তেমনি। বলা যায় জামাতে সালাতেরই বৃহত্তম সংস্করণ হজ্ব। এই দীনের সমস্ত জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হোচ্ছে এবাদতের স্থানগুলি অর্থাৎ মসজিদ, কারণ মোসলেমদের জীবনের, জাতীয় ও ব্যক্তিগত উভয় জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য এবলিসের চ্যালেঞ্জে আল্লাহকে জয়ী করানো ও পৃথিবীতে ন্যায় বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা। সুতরাং মোসলেমের জীবনে ইহজীবন ও পরজীবনের, দেহের ও আত্মার, শরীয়াহ ও আধ্যাত্মিকতার কোন বিভক্তি থাকতে পারে না কারণ দেহ থেকে আত্মার পৃথকীকরণ বা আত্মা থেকে দেহ পৃথকীকরণের একটাই মাত্র পরিণতি-মৃত্যু। তাই এই জাতির সমস্ত কর্মকাণ্ড এক অবিচ্ছিন্ন এবাদত। জামাতে নামাযের উদ্দেশ্য হলো মোসলেম পাঁচবার তাদের স্থানীয় কর্ম-কাণ্ডের কেন্দ্র মসজিদে একত্র হবে, তাদের স্থানীয় সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা পরামর্শ কোরবে, সিদ্ধান্ত নেবে, তারপর স্থানীয় এমামের নেতৃত্বে তার সমাধান কোরবে। তারপর সপ্তাহে একদিন বৃহত্তর এলাকায় জামে মসজিদে জুম’আ’র নামাযে একত্র হোয়ে ঐ একই কাজ কোরবে। তারপর বছরে একবার আরাফাতের মাঠে পৃথিবীর সমস্ত মুসলিমদের নেতৃস্থানীয়রা একত্র হোয়ে জাতির সর্বরকম সমস্যা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা কোরবে, পরামর্শ কোরবে, সিদ্ধান্ত নেবে। অর্থাৎ স্থানীয় পর্য্যায় থেকে ক্রমশঃ বৃহত্তর পর্য্যায়ে বিকাশ কোরতে কোরতে জাতি পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু মক্কায় একত্রিত হবে। একটি মহাজাতিকে ঐক্যের সুদৃঢ় বন্ধনে বেঁধে রাখার কী সুন্দর প্রক্রিয়া।
একটি ঘড়ির উদ্দেশ্য হোচ্ছে সময় জানা। এজন্যই ঘড়িটি তৈরী করা হোয়েছে। এখন যদি ঘড়িটি সময় না দেয়, অর্থাৎ সেটা দিয়ে যদি উদ্দেশ্য অর্জিত না হয় তাহোলে সেই ঘড়ি থাকা না থাকা সমান। লক্ষ কোটি হীরা জহরতের তৈরী ঘড়ি থাকলেও সেগুলি দিয়ে সময় দেখা যাবে না, অর্থাৎ অর্থহীন। যে উদ্দেশ্যে আল্লাহর রসুল জুম’আর মত একটি সামষ্টিক ও জাতীয় এবাদতের প্রবর্তন কোরেছেন পৃথিবীর কোথাও আজ সেই উদ্দেশ্য অর্জিত হোচ্ছে না।
Posted ২১:২৬ | রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৩
Swadhindesh -স্বাধীনদেশ | admin