| রবিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০১৩ | প্রিন্ট
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে ক্ষমতাসীন মহাজোটের প্রধান শরিক দল আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের পর মনোনীত প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের আনন্দোল্লাসের পাশাপাশি ক্ষোভ-হতাশা বিরাজ করছে বিপরীত শিবিরে। এবার বিভিন্ন আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন সাত নতুন মুখ। এতে তরুণদের প্রাধান্য বেশি। দলীয় লেভেলে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে থাকা সম্ভাব্যদের পরিবর্তে একেবারে আনকোরা নতুন মুখ দেখে অনেকে বিস্মিত।
সবচেয়ে বড় চমকটি এসেছে চট্টগ্রাম-৪ সীতাকুণ্ড এবং চট্টগ্রাম-১৫ সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে।
সীতাকুণ্ডে মনোনয়ন পেয়েছেন আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা হওয়া সিটি মেয়র মনজুর আলমের ভাতিজা দিদারুল আলম। আলম চেম্বারের পরিচালক। দলীয় রাজনীতিতে তেমন সক্রিয় ছিলেন না । হঠাৎ করে কিভাবে দলীয় টিকেট ম্যানেজ করলেন তা এখন আলোচনার হটকেক। সে আসনে বাদ পড়েছেন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করা বর্তমান সংসদ সদস্য আবুল কাশেম মাস্টার। এ নিয়ে সেখানে ক্ষোভ দানা বাঁধছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের আন্দোলনে সারাদেশে আলোড়ন তোলা হটস্পট খ্যাত সীতাকুণ্ডে আন্দোলন মোকাবেলায় বর্তমান এমপি কাশেম মাস্টারের ব্যর্থতা আর দলত্যাগী মেয়র মনজুরের ঘরে ‘নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী’ দাঁড় করানোর হিসাব-নিকাশ মাথায় রেখে নুতন মুখ দিদারুল আলমকে বিবেচনায় আনা হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। তার টাকা-পয়সাও ভালো। এটাও সাফল্য লাভে ভালো ফ্যাক্টার বলে অনেকে মন্তব্য করছেন।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১৫ সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনটি আগাগোড়াই ১৮ দলের বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে বিবেচিত। ১৯৭৩ এর নির্বাচনে ন্যাপের বিজয়ী প্রার্থী মোসতাক আহমদের ফল পাল্টে নৌকার এম সিদ্দিককে বিজয়ী ঘোষণা ছাড়া এ আসনে বিগত ৪০ বছরে বিএনপি-জামায়াত ঘরানার বাইরের কারো বিজয়ের ইতিহাস নেই। সে আসনে বার বার প্রার্থী পরিবর্তন করেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়া তো দূরের কথা, জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসাও সম্ভব হয়নি। গত সংসদ নির্বাচনে দেশব্যাপী করুণ অবস্থার মধ্যেও এ আসনে বেশ দাপটের সঙ্গে নির্বাচিত হন বিএনপি-জামায়াত জোটের টিকেটে মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা শামসুল ইসলাম।
এ কারণে এবার চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এককালীন শিক্ষক ও জামায়াত ঘরানার লোক ড. আবু রেজা মো. নিজামুদ্দিন নদভীকে প্রার্থী হিসাবে বেছে নেয়া হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের প্রবীণ জামায়াত নেতা মওলানা মুমিনুল হক চৌধুরীর মেয়ে জামাতা ড. নদভী অনেক দিন হতে যে দল থেকেই হোক- সংসদ নির্বাচন করার একটা মওকার খোঁজে মরিয়া ছিলেন। এবার সফল হলেন। সেখানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আমিনুল ইসলামের নির্বাচন করার জোর প্রচেষ্টা চালানো হলেও নদভীর টিকেট পাওয়া অনেকের কাছে বিস্ময়কর ঠেকেছে।
পিতা বিশিষ্ট আলেম মাওলানা ফজলুল্লাহর নামে গড়া এনজিও ‘আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশন’ এর নামে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে কুয়েত থেকে আনা ফান্ডের টাকায় বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ নির্মাণ, রাজনৈতিক ভিআইপিদের এলাকায় মসজিদ নির্মাণ করে দেয়া, কোরবানির গরু বিতরণের মাধ্যমে একটা ফিল্ড তৈরির অব্যাহত প্রচেষ্টা আছে নদভীর। জামায়াত-শিবিরের দুর্গে হানা দেয়া, সারা দেশের আলেম ওলেমাদের এবং মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক প্রচারণায় কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীলদের’ দল আওয়ামী লীগ একজন পুরানো জামায়াতিকেই তাদের টিকেট তুলে দিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম-৩ আসন সন্দ্বীপে দেয়া হয়েছে বিসিআই ব্যাংক কেলেঙ্কারি খ্যাত সাবেক এমপি মরহুম মোস্তাফিজুর রহমানের ছেলে মাহফুজুর রহমান মিতাকে। মিতা গতবার আনারস প্রতীকে স্বতন্ত্র (মূলত বিদ্রোহী ) হিসেবে নির্বাচন করে নৌকার মূল প্রার্থী জামাল উদ্দিন চৌধুরীর চেয়ে তিন হাজার ভোট বেশি পেয়েছিলেন। সেখানে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা। কয়েকদিন আগে এমপি পাশার বাড়িতে আগুন আর বড় ছেলেকে গুলি করে তৎপরতা দেখানোর কারণেই মিতাকে দলীয় মনোনয়ন দেয়ো হয়েছে বলে মনে করেন অনেকেই।
চট্টগ্রাম-২ আসন ফটিকছড়িতে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক এমপি মরহুম রফিকুল আনোয়ারের মেয়ে খাদিজাতুল আনোয়ার সনি। সেখানে বর্তমান এমপি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। সে আসনে এবার তার পরিবর্তে ১৮ দল থেকে মিসেস সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে নির্বাচনে দাঁড় করানোর হিসাব থেকে একজন মহিলাকে আওয়ামী লীগ বেছে নিয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। সে আসনে ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা এ টি এম পেয়ারুল ইসলামের পরিবর্তে সনিকে দেয়ায় পেয়ারুলের কর্মী-সমর্থকেরা ভীষণ ক্ষুব্ধ ও হতাশ।
এছাড়া চট্টগ্রাম-১৬ বাঁশখালীতে ঘোষণা দিয়ে পুনর্বার প্রাথী পরিবর্তন করে শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানকে। অনেকদিন ধরে মনোনয়র দৌড়ে থাকা শিল্পপতি আবদুল্লাহ কবীর লিটন হঠাৎ বাদ পড়ায় আর পুরানো আওয়ামী লীগ প্রার্থী সুলতানুল কবির চৌধুরী একধরনের ‘সিন আউট’ হয়ে যাবার কারণে দলটি বেশ কোন্দলের মুখে পড়তে পারে বলে আশংকা করছেন অনেকেই।
চট্টগ্রাম-১৩ আসন আনোয়ারা-পটিয়াতে মনোনয়ন পেয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মরহুম আখতারুজ্জামান চৌধুরীর ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। অবশ্য তিনি বছর খানেক আগে তার পিতার মৃত্যুতে শূন্য আসনে উপ-নির্বাচনে দলের প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
চট্টগ্রাম-১৪ চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আসনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিনের পরিবর্তে নজরুল ইসলাম চৌধুরীকে। সে আসনে ৭৯ সালের পর থেকে কর্নেল অব. অলি আহমদ ছাড়া কেউ বিজয়ী হতে পারেননি। এ কারণে প্রার্থী পরিবর্তন করে চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অনেকের অভিমত। অবশ্য ঠিকাদার-ব্যবসায়ী নজরুল ইতিপূর্বে অলি আহমদের সহধর্মীনীর সঙ্গে উপ-নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে পরাজিত হয়েছিলেন।
মহাজোটের শরিক দলের দুই শক্তিশালী প্রার্থীর আসনেও দলীয় নতুন প্রার্থী দিয়ে অনেক প্রশ্ন আর চমকের জন্ম দেয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম-৫ হাটহাজারী আসনে জাপার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ গতবার মহাজোটের ব্যানারে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার সে আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিয়েছে ইউনুস গনি চৌধুরীকে। চৌধুরী উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সিডিএ’র পরিচালনা পরিষদ সদস্য। অন্যদিকে চট্টগ্রাম-৮ আসনে ( চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) মহাজোটের শরিক জাসদের মাঈনুদ্দিন খান বাদলের আসনে প্রার্থী করা হয়েছে সিডিএ’র চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামকে।
ইউনুস গনি ও ছালামকে মহাজোটের সমীকরণে শেষ পর্যন্ত বাদ দেয়া হতে পারে বলে জোর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন সাময়িকভাবে দলীয় প্রার্থীর টিকেট লাগিয়ে দেয়া হলো সেটা নিয়ে আলোচনা আর প্রশ্ন উঠেছে।
Posted ০২:৪৪ | রবিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০১৩
Swadhindesh -স্বাধীনদেশ | admin