শুক্রবার ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইহজাগতিকতা ও ইসলামী আন্দোলন

  |   সোমবার, ১৭ মার্চ ২০১৪ | প্রিন্ট

আবদুল কাদির সালেহ

Professor abdul quadir saleh

ইহজাগতিকতার সাথে ইসলামী আন্দোলনের স¤পর্ক কিরূপ এর সম্যক উপলব্দি তখনই আসবে, যখন একজন ইসলামী আন্দোলনের কর্মী জীবনের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যের গভীরে পৌছাতে পারবেন। জগৎ থেকেই জাগতিকতা। জগতের রূপ রস গন্ধ ও মাধূর্যে জীবনকে পরিপুষ্ঠ করে তোলাই ইহজাগতিকতা। জীবনতো ইহজাগতিকতার মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠে। কিন্তুু এ জীবনকে ইহজাগতিকতার শৃংখলে বন্দি করে রাখা হবে কিনা এটা নির্ভর করে ব্যক্তির ইচ্ছা, চিন্তাশক্তি, রুচি জ্ঞান ও অঙ্গিকারের উপর। কোনটা বড় জীবন না জগৎ ? জগৎকে বাদ দিয়ে জীবন নয় সত্যি, কিন্তুু জগৎ কখনো বড় নয় জীবনের চেয়ে-এই বিবেচনাটা প্রায়শই ঢাকা পড়ে যায় যে আমাদের মাঝে, এটাই ভাবনার বিষয়। এই ভাবনাটা আরও প্রকট হয় যখন দেখি জগৎকে পাল্টাবার কথা যারা বলেন তারাই জীবনটাকে পাল্টে নিচ্ছেন জগতের দিকে। তাই যদি হবে তাহলে পার্থক্য কী সাধারনের সাথে আমার ? আল্লাহ কোরআন দিয়েছেন সকল মানুষের জন্য। কোরআন এসেছে মানুষের জীবনকে পাল্টে দেয়ার জন্যেই। জাগতিক শৃংখল, সামাজিক সংস্কার আর মানসিক দ্বিধা ও দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে জীবনের বিশালত্বের আহবান নিয়ে। এ আহবান গ্রহন করেছে কতজন? আর যারাওবা গ্রহন করেছে তাদের জীবনে এর প্রতিফলন কতখানি ? আল্লাহ বলেন, “জগৎতো খেল তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়”(মুহাম্মদ-৩৫) অন্যত্র আল্লাহ পাক খানিক বিস্ময় প্রকাশ করেই বলেন, আরাদীতুম বিল হায়াতিদদুনিয়া মিনাল আখিরাহ, ফামা মাতাউল হায়াতিদ দুনিয়া ইল্লা কালীল অর্থাৎ দুনিয়ার জীবন নিয়েই পরিতুষ্ট থাকতে চাও অথচ দুনিয়ার এই পার্থিব জীবনতো আখেরাতের তুলনায় তুচ্ছ মাত্র-কিছুই নয়।”( আততাওবা-৩৮)

এই তুচ্ছ বা সামান্য জিনিশের পেছনে জীবনের মহত্বকে উৎসর্গ করা কতটুকু সুবিবেচনার কাজ ? রোদ বৃষ্টির খেলার মধ্যে আকাশে দেখা দেয় এক ধরনের বর্ণিল আভায়। যাকে সবাই বলে রঙধনু। কিন্তুু একেই জীবনের সাতরঙ মনে করে কেউ যদি অবগাহন করতে চায় তাহলে বুঝতে হবে ক্ষুদ্র এবং মহৎ এর পার্থক্য তিনি ধরতে পারেননি। কিংবা মহৎকে জীবনের মধ্যে স্থিতি দানের যে স্থিরতা সেটা তার মধ্যে প্রষ্ফুটিত হয়নি এখনও। খুব স্থুল করে যদি বলি- বসবাসের জন্য একটা নিরাপদ ঘর চাই। তাই বলে ঘরের মধ্যেই নিজেকে বন্দি করে রাখা সমর্থনযোগ্য নয়। ঠিক পাখির জন্য যেমন নীড়। নীড় আর খাঁচার পার্থক্যটাও সামনে থাকা চাই আমাদের। নীড়টা বসবাসের জন্য, বন্ধীত্বের নয়। এই খড়কুটার নীড়টাই যখন ই¯পাত-লোহার মূল্যবান ধাতব সহ কারিগরি কুশলতায় নির্মিত হয়, তখন এটা হয় খাঁচা-পিঞ্জর। এ পিঞ্জর মূল্যবান, দৃষ্টিনন্দন, কিন্তুু জীবনের জন্য গ্লানিকর। জীবনের মহত্বকে যদি কেউ না বুঝেন তাহলে তার বন্দীত্ব ঘুচবার আর কোন উপায় থাকেনা।

ইসলামি আন্দোলনের শ্লোগান বাংলাদেশে পূর্ব থেকে আরও বেশি উচ্চকিত আজ। কিন্তুু এর নৈতিক প্রাণশক্তি পূর্বের তুলনায় কি মজবুত হয়েছে ? এ প্রশ্নটি আজ সবাই এড়িয়ে যাচ্ছেন। কিন্তুু দূর্ববল যে হয়েছে এটা অনুভব করছেন সবাই। বলছেননা মুখে ফুটে – এই টুকু যা । না বলাটাতো দূর্বলতা থেকে বেরিয়ে আসার কোন লক্ষন না। বরং দূর্বলতার পঙ্কে আরো নিমজ্জিত হওয়ার আলামত মাত্র। এই আলামতকে পুষে রাখলে লাভ ইসলামী আন্দোলনের হয়না, হয় ইহজাগতিকতার।

ইহজাগতিকতার পসার যতো বাড়বে, ইসলামী আন্দোলন দূর্বল হবে ততই । ইহজাগতিকতার সহজ অর্থ হলো দুনিয়ার পূজা। যে দুনিয়াকে পাল্টে দেয়া ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্য, সে দুনিয়াকে কুর্নিশ করলে কী আর চলে ? দুনিয়ার প্রতি ভালবাসাই তো সকল পাপ ও দূর্বলতার উৎস। “হুব্বুদ দুনিয়া রা’সু কুল্লু খাতিয়াতিন।” ব্যবসা -বাণিজ্য, অর্থোপার্জন, ভাল রেজাল্ট, ভাল চাকুরী, কোনটাই নিন্দনীয় নয় যদি তা পূজনীয় হয়ে না উঠে। এসবের পূজনীয় হয়ে উঠা বুঝা যাবে-ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্ব পালনে এগুলো কতটুকু বাধাঁ হয়ে দাড়িয়েছে, তখন। যেমন দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া, অহমিকা লালন বা প্রকাশ করা, দূশ্যত মাইনর কাজকে নিজের অবস্থান ও আতœসম্মানের জন্য অর্মযাদাকর মনে করা, আনুগত্যে শিথিলতা, নিজ পছন্দকে আন্দোলনের স্বার্থে কুরবানী করতে না পারা ইত্যাদি। ব্যক্তি বুঝতে পারেনা এগুলো তাকে দুনিয়াদার বানাচ্ছে কীভাবে ? এই বুঝতে না পারার কারনেই সে এসব পরিহার করার চিন্তাও করেনা। বরং এর পেছনে খুজে অমোঘ যুক্তি। এ ক্ষেত্রে এটা মনে রাখা দরকার শয়তান ও যুক্তি খুজে পেয়েছিল আদমকে সেজদা না করার। সে যে কারনে অহমিকা দেখালো এটা তেমন ব্যাপার ছিলনা – ছিল আল্লাহর হুকুম অমান্য করার বিষয়টি। তাই অহমিকা প্রর্দশন বা যুক্তি তালাশ-কারীরা একধরনের ঘোর বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েন, আনুগত্যহীনতাটা ধরতে পারেননা।

ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) বলেছেন, একজন বান্দা যখন আল্লাহর পথে চলার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে তখন সর্বপ্রথম তার সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় দুনিয়া। এই দুনিয়া বা ইহজাগতিকতার ডালপালা অনেক বিস্তৃত। যেমন অক্টোপাশ। অক্টোপাশের থাকে অনেক গুলো হাত পা। আবার প্রতিটি হাতের থাকে অগনিত চুম্বক বোতাম। প্রাণিটা দৃশ্যত নিরীহ গোচের। কিন্তুু একবার যদি কেউ এর জালে আটকা পড়ে তাহলে বের হয়ে আসার আর উপায় থাকেনা। ইহজাগতিকতার জালও তেমনি।

ইহজাগতিকতা ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে কতটুকু প্রবেশ করেছে তা বুঝা যাবে একটা সহজ দৃশ্যকল্প সামনে আনলেই। ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্য যদি হয় সমাজ বদল, তাহলে সে সমাজ বদলের শ্লোগানটা গেলো কই ? বরং সমাজ বদলের পরিবর্তে সামাজিক অংশ গ্রহনের ধারনাটাই এখানে স্থান দখল করেছে আজ। একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারা যাবে এই সমাজকে যারা বানালো তারাইতো এই সমাজে মানানসই। এখানে ইসলামী আন্দোলনের শরীকরা পিপীলীকার উচ্ছিষ্ট ভোগের মতো। ব্যঘ্র যখন কোন বনগরু শিকার করে প্রথম ভাগটাতো তারই। হায়েনারা এসময় একটু দূরে থাকে । ব্যাঘ্রের উদরপূর্তি হয়ে গেলে অনতিদূরের হায়েনারা ও শরীক হয় এতে। তারপর আসে কুকুর, কুকুরেরা হাড়গোড় টানাটানি করার কালে আবির্ভাব ঘটে শুকুনের । তারা শিকারের অবশিষ্টাংশ টুকু টুকরে টুকরে খায়। সবকিছু সাবাড় করার পর কেঁেচা-পিপীলিকারা, যদি কিছু থাকে তার জন্য লাইন ধরে। এরা বন্য প্রাণীকূলের মধ্যে তেমন ধর্তব্য কেউ নয়।

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে আর সব গুনাবলীর মধ্যে অন্যতম প্রধান যে দুটি বৈশিষ্ট থাকা দরকার – একটি হলো সমাজ বদলের অঙ্গীকার আরেকটি হলো আত্মোৎর্সগ যা শাহাদাতের তামান্না। ইসলামী মাহফিল গুলোতে বা ইসলামী তারাবিয়াহ প্রোগ্রাম গুলোতে যখন দোয়া করা হয়, হে আল্লাহ আমাদের হায়াতে বরকত দাও ! হে আল্লাহ আমাদেরকে বাতিলের উপর বিজয় দান কর ! হে আল্লাহ বাতিলকে ধ্বংশ করো ! হে আল্লাহ আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের কামিয়াবী দান কর, তখন যতো আবেগ উচ্ছাস ও উচ্চ স্বরে আমীন আমীন বলা হয়, সেই কামিয়াবীর জন্য শাহাদাতের তামান্নাও যে জরুরী তা যখন আল্লাহর কাছে চাওয়া হয় তখন আমীনের স্বর তত উচ্চ হয়না। কেন হয়না – এ আমাদের ভয় হয়তোবা । যদি আল্লাহ অবশেষে দোয়া কবুল করে বসেন।

তাই বলি ইহজাগতিকতাকে পরিহার করতে না পারলে ইসলামী আন্দোলন কামিয়াব হতে পারবেনা। যারা ইসলামী আন্দোলন করেন, তাদের তাই খুঁজা দরকার ব্যক্তি অথবা দল কার মধ্যে কোথায় কতটুকু আছে ইহজাগতিকতা। খুজলেই হবেনা শুধু, তা থেকে বের হয়ে আসার পথ ও খুজতে হবে। সবার ।

লেখক পরিচিতি : অধ্যাপক মাওলানা আবদুল কাদির সালেহ

সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও শিক্ষাবিদ ,  সাবেক সহকারী সম্পাদক, দৈনিক আল-মুজাদ্দেদ ।

advertisement

Posted ১৯:৪৭ | সোমবার, ১৭ মার্চ ২০১৪

Swadhindesh -স্বাধীনদেশ |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

Advisory Editor
Professor Abdul Quadir Saleh
Editor
Advocate Md Obaydul Kabir
This newspaper (Swadhindesh) run by Kabir Immigration Ltd
যোগাযোগ

Bangladesh Address : Moghbazar, Ramna, Dhaka -1217, Europe Office: 552A Coventry Road ( Rear Side Office), Small Heath, Birmingham, B10 0UN,

ফোন : 01798-669945, 07960656124

E-mail: news@swadhindesh.com, swadhindesh24@gmail.com