| মঙ্গলবার, ০৭ জানুয়ারি ২০১৪ | প্রিন্ট
স্টাফ রিপোর্টার : নির্বাচনের নামে ৫ জানুয়ারি যা ঘটেছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। অবৈধ ভোটের মহোত্সবে বিরোধী দল ও ভোটারবিহীন এ নির্বাচন কখনও বৈধ নির্বাচন হতে পারে না। অবৈধ ও কলঙ্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারও বৈধতা পাবে না। সাংবিধানিকভাবে এ সরকার হবে অবৈধ। সুতরাং হতাশ হওয়ার কোন কারণ নেই। এখন সময় এসেছে অবৈধভাবে নির্বাচিত এ সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার। যার যার অবস্থান থেকে প্রত্যেককেই অবৈধ এ সরকারের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে ‘৫ জানুয়ারির কলঙ্কের নির্বাচন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, টিভি ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব, চিকিত্সক, প্রকৌশলীসহ পেশাজীবী নেতারা গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে এভাবেই মূল্যায়ন করেন। তারা বলেন, ওই নির্বাচনে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতিই প্রমাণ করে জনগণ প্রহসনের এ নির্বাচন ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। ধিকৃত ও গণবিচ্ছিন্ন সরকারের কাছ থেকে এমন কলঙ্কিত নির্বাচন ছাড়া আর কিছু আশা করা যায় না। সরকারের উদ্দেশে বক্তারা বলেন, এখনও সময় আছে, গণতন্ত্র ও জনগণের কাতারে আসুন। গণমানুষের দাবি মেনে নিয়ে সংসদ ডেকে, সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন। তা না হলে সরকারকে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। আলোচনা সভায় ৫ জানুয়ারির কলঙ্কিত নির্বাচনের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ।
আলোচনা সভায় নির্বাচন নিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়ে বের হওয়ার পথেই আটক করা হয় বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনকে। এ ঘটনার প্রতিবাদে প্রেস ক্লাব চত্বরেই বিক্ষোভ করেন আইনজীবীসহ পেশাজীবীরা।
সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি রুহুল আমিন গাজীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, জাহাঙ্গীরনগব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. খন্দকার মোস্তাহিদুর রহমান, বিএফইউজে মহাসচিব ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট টিভি ব্যক্তিত্ব ড. পিয়াস করিম, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের মহাসচিব ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি কবি আবদুল হাই শিকদার, বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব চাষী নজরুল ইসলাম, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি ডা. এ কে এম আজিজুল হক, ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ, ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (আইইবি) সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মিয়া মো. কাইয়ুম, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম মিয়া, বিএফইউজের সহকারী মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. আবদুল মান্নান মিয়া, ঢাবি অধ্যাপক ড. আখতার হোসেন খান ও অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম, জাবির অধ্যাপক ড. শামসুল আলম সেলিম, ড্যাবের সহ-সভাপতি ডা. আবদুস সালাম, যুগ্ম-মহাসচিব ডা. এম এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, কৃষিবিদ ইব্রাহিম খালেদ, শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের অতিরিক্ত মহাসচিব মো. জাকির হোসেন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের শিক্ষক অধ্যাপিকা ড. শাহানাজ সরকার রানু, ড্যাবের সহ-সভাপতি ডা. রফিক আল ফকির লাবু, কৃষিবিদ গোলাম কবির দুলাল, অ্যাডভোকেট এবিএম ওয়ালিউর রহমান খান, প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান মানিক প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন এ্যাব নেতা প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম রিজু।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কলঙ্কিত নির্বাচন উল্লেখ করে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, অবৈধ ভোটের মহোত্সবে বিরোধী দল ও ভোটারবিহীন এ নির্বাচন কখনও বৈধ নির্বাচন হতে পারে না। অবৈধ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারও সাংবিধানিকভাবে অবৈধ। সুতরাং হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। এখন সময় এসেছে অবৈধভাবে নির্বাচিত এ সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে কলঙ্কিত নির্বাচন ছাড়া আর কিছু আশা করা যায় না। আর তারা সেটাই জনগণকে উপহার দিয়েছে।
শেখ হাসিনার উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনার সরকারের কোনো বৈধ ও সাংবিধানিক অধিকার নেই। কারণ সংবিধান অনুয়ায়ী আপনার সরকার কাজ করেনি। ইচ্ছা করলে এখনও সংসদ অধিবেশন ডেকে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে পারেন। আপনি ১৬ কোটি মানুষের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। কিন্তু আপনি সেটা করবেন না। কারণ, আপনার আশপাশের মানুষ আপনাকে ভুল বোঝাচ্ছে। তবে ভুলের খেসারত আপনাকে একাই দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আপনি বলেছেন নির্বাচনে ৩০ ভাগ ভোট পড়েছে। তাহলে ৭০ ভাগ মানুষই আপনাকে বর্জন করেছে। এই ৭০ ভাগ মানুষ কি স্বাধীনতাবিরোধী? তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তাই দেশের স্বার্থে আপনি এখনই পদত্যাগ করুন।
ভারত সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনারা ভুল পথে পা দিয়েছেন। কারণ, এটা নেপাল ও ভুটান নয়, এটা স্বাধীন বাংলাদেশ। সাবধান হয়ে যান, এ দেশের মানুষ কারো তাঁবেদারি পছন্দ করে না। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম স্বাধীন হওয়ার জন্য, ভারতের সেভেন সিস্টার রক্ষা করার জন্য নয়। বাংলাদেশ সিকিম নয়। ভারতের নেতাদের কথায় মনে হয় এটা ভারতের কোনো অঙ্গরাজ্য।
ধিকৃত ও গণবিচ্ছিন্ন সরকারের কাছ থেকে এমন কলঙ্কিত নির্বাচন ছাড়া অন্যকিছু আশা করা যায় না উল্লেখ করে সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, এখনও সময় আছে, গণতন্ত্র ও জনগণের কাতারে আসুন। গণমানুষের দাবি মেনে নিয়ে সংসদ ডেকে, সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন। তা না হলে সরকারকে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে।
রুহুল আমীন গাজী প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনার পিতা রক্ষীবাহিনী, লাল, নীল, সবুজ বাহিনী সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। আপনিও অত্যাচার নির্যাতন করে ১৬ কোটি মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারবেন না। জনগণ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। কলঙ্কের নির্বাচন জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যে ভোট পেয়েছি আমি তাতেই সন্তুষ্ট’। কারণ, জনগণ তার সঙ্গে নেই। জোর করে ব্যালটে সিল মারতে পারলেও ১৬ কোটি মানুষকে আপনি দাবিয়ে রাখতে পারবেন না।
অধ্যাপক পিয়াস করিম বলেন, নির্বাচনের নামে ৫ জানুয়ারি যা ঘটেলো তা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আইনগতভাবেও এ নির্বাচন অবৈধ। অধিকাংশ মানুষের ভোট না দেয়া, বিরোধী দল না আসায় এটি বৈধ নির্বাচন হতে পারে না। সুতরাং এ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারও অসাংবিধানিক। হতাশ হলে হবে না, প্রত্যেককে যার যার অবস্থান থেকে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, জনগণ যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে তা বোঝার জন্য বিএনপি কর্মী হওয়ার প্রয়োজন নেই। যারা টিভির পর্দায় এটি প্রত্যক্ষ করেছে তারা সবাই এটি বুঝতে পেরেছেন।
‘যারা ভোট দেয়নি তারা স্বাধীনতা বিরোধী’—প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, তাহলে ভোট প্রদান করা দেড় কোটি মানুষের বাইরে ১৫ কোটি মানুষ কি স্বাধীনতা বিরোধী? তিনি বলেন, ৯৭ ভাগ মানুষ মনে করে নির্বাচন সঠিকভাবে হয়নি। দেশ-বিদেশে নৈতিকভাবে এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। এ সময় তিনি বলেন, শুধু একটি দেশের কারণে সরকার নির্লজ্জের মতো আচরণ করছে।
কলঙ্কিত নির্বাচনের সমালোচনা করে চাষী নজরুল ইসলাম বলেন, যে নির্বাচনে ১৫৩জন জনগণের ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছে সেই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলাও অবান্তর। এ সময় তিনি বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া অবরুদ্ধ, সম্পাদক মাহমুদুর রহমান কারারুদ্ধ, আমার দেশ, দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি বন্ধ থাকায় সরকারের সমালোচনা করেন। অধ্যাপক খন্দকার মোস্তাহিদুর রহমান বলেন, অবৈধভাবে নির্বাচিত এ সরকারের নৈতিক ভিত্তি নেই দেশ পরিচালনার। সুতরাং আর জেদের বশে নয়, সমঝোতায় আসুন।
কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, দেশের প্রধান সমস্যা এখন ভারত। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার পেছনে ভূমিকা রয়েছে ভারতের। এই ভারত ব্যাপক সমর্থন দিয়েও শেখ মুজিবকে রক্ষা করতে পারেনি। এখন শেখ হাসিনাকেও রক্ষা করতে পারবে না।
৫ জানুয়ারির কলঙ্কিত নির্বাচনের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরে সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, বিরোধী দলবিহীন ৫ জানুয়ারির কলঙ্কিত নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একট খারাপ নজির হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই নির্বাচনকে অনেকেই ‘গণতন্ত্রের ট্রাজেডি’ ও ‘শতাব্দীর ঘৃণ্যতম নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ভোটার, প্রার্থী ও ভোটবিহীন এ নির্বাচন ছিল আসন ভাগাভাগির নির্বাচন। কলঙ্কিত সব অনুষঙ্গই ছিল এ নির্বাচনকে ঘিরে।
এম আবদুল্লাহ বলেন, প্রহসনের এ নির্বাচন প্রতিরোধে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে আহ্বান জানিয়েছিলেন জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রহসনের নির্বাচন বয়কট করেছেন।
Posted ০২:০৯ | মঙ্গলবার, ০৭ জানুয়ারি ২০১৪
Swadhindesh -স্বাধীনদেশ | admin