মাহমুদ হাছান | মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট
মাহমুদ হাছান
গত রমজান মাসটা ছিলো আমার জীবনের জন্য বিশেষ তাতপর্যপূর্ন। এ সময়টা ছিলাম জর্ডানে । আমার একটা ইচ্ছা ছিলো মুসলিম দেশ গুলো ভ্রমনের মাধ্যমে আমার স্ত্রী কে ইসলামী সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। জর্ডান নিয়ে আরেক দিন লিখবো। আজ মন বলছে জেরুজালেম নিয়ে লিখি । জেরুজালেম যাওয়ার কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিলো না। জর্ডানে ইসলামের ইতিহাস আমাদের কে অভিভূত করে। আমরা দুদিন রেখেছিলাম আকাবাতে। এরই মধ্যে আমরা বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে জেরুজালেম যাওয়া নিয়ে রিসার্চ শুরু করি । অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেই আমরা আকাবাতে না গিয়ে ঐ সময়টা জেরুজালেম কাটাবো , যদি কোনো কারনে যেতে না পারি তাহলে আকাবাতে তো হোটেল বুকিং করা আছেই । ৭ মার্চ শুক্রবার আমরা বর্ডারে উপস্থিত হই । ইসরাইলের ইমিগ্রেশনে যাওয়ার সাথে সাথেই আমার স্ত্রীকে ভিসা দিয়ে দেওয়া হয় কিন্তু আটকা পড়ি আমি । মনে মনে শুধু জিকির করছি , আল্লাহর কাছে দোয়া করছি – হে আল্লাহ আমাকে এতো কাছে থেকে ফিরিয়ে দিও না। শুক্রবার দিন ভিসা না হলে আর যাওয়া হবে না কারন শনি , রবি বন্ধ। আল্লাহর অশেষ রহমতে ৬ ঘন্টা পর আমার ইন্টার ভিউর ডাক পড়লো। আমি ভিসা পেয়ে গেলাম । উল্লেখ্য অনেকের ভিসা রিফিউজ হচ্ছিল ।
ট্যাক্সীতে করে যাচ্ছি আমরা তিন জন – আমি , আমার স্ত্রী ও হামজা নামের এক প্যালেস্টানিয়ান ভাই। হামজার কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই ।
জেরুজালেমের মাটিতে পা রাখলাম ইফতারের কিছুক্ষন আগে । হোটেলে না গিয়ে সোজা চলে গেলাম মসজিদুল আকসায় । আমি আমার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিনা । আমার অনুভূতি গুলো আমার সাথে প্রতারনা করছে না তো ? রাস্তার মোড়ে মোড়ে অস্ত্রধারী পুলিশের মহড়া। চারিদিকে অবিশ্বাসের পোড়া গন্ধ। শতশত নবী রাসূলদের পদচারণায় মুখরিত ছিলো যে রাস্তাগুলো সেই সরু রাস্তা দিয়ে আমি হাঁটছি । মুসলিম কোয়াটারের প্রতিটি ধুলিকনা ধারন করে আসছে হাজার বছরের ইতিহাস । দুঃসাহসী মানুষ গুলোর কাছে নিজেকে ভীরু আর কাপুরুষ মনে হতে লাগলো । তবুও নির্লজ্জের মতো ভীড় ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছি।ঠিক মসজিদের গেইটে আটকে দিলো আমার স্ত্রীকে । মুসলিম না হলে ঢোকা যাবে না । আমার বিয়ের সার্টিফিকেট ছিলো আরবীতে । সেটা দেখিয়া পার পেয়েগেলাম । চোখে ভেসে উঠলো সোনালী গুম্বুজ দ্যা ডোম অফ রক । আলহামদুলিল্লাহ। মসজিদুল আকসার পুরো এলাকাটিই আকসা বলে গন্য হয় ।যদিও মসজিদুল আকসা একটি পৃথক মসজিদ। সোনালী গুম্বুজ ওয়ালা মসজিদটিতে মহিলারা নামাজ পড়েন তবে পুরুষদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় । তাড়াতাড়ি ভিতরে গিয়ে দেখতে পেলাম ছোট পাহাড়ের মতো বিরাট পাথর । তার ঠিক নিচে ছোট্ট গুহার মতো জায়গা ।ওখানেই নামাজ পড়ে একটু সময় পার করতে না করতেই মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে গেলো । নামাজ শেষ করে হাঁটতে বেরুলাম ইতিহাসের সরু রাস্তা দিয়ে। অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য।
জেরুজালেমের রাস্তাগুলো চারটি ভাগে বিভক্ত। জুইস কোয়াটার , মুসলিম কোয়াটার , খ্রীষ্টান কোয়াটার ও আর্মেনিয়ান কোয়াটার । তিনটি বৃহৎ ধর্মের তীর্থ স্থান। পাথরগুলোকে কেনো জানি জীবন্ত মনে হয় । রাস্তাগুলো সরু, তার ভিতরে ছোট ছোট খুপরির মতো বাড়িগুলোতে অদম্য সাহসী মানুষের বাস । বাচ্চাগুলো আমাদের বাচ্চাদের মতো না । সারা দিন হৈ হোল্লোর করে বেড়াচ্ছে । চোখে মুখে নেই কোনো ভয়। ইতিহাসের বইতে পড়ছিলাম সাদা কালোর সেগ্রিগেশনের গল্প অথবা ছবিতে দেখেছিলাম সাদা কালোর বিভেদ । ওখানে মুসলিম আর জুইসদের সেগ্রিগেশন নিজের চোখে দেখে এলাম । এরা এ পাশে হাটছে তো ওরা ও পাশে । রাস্তার ও পাশে সেটেলার এ পাশে ঢাকনাতে ঢাকা প্যালেষ্টানিয়ান। কেমন জানি বোতল বন্দী জীবন । নিজের বাড়িতে নিজেই পর । প্রথম দিন এভাবেই কাটলো । হাটতে হাটতে চলে গিয়েছিলাম Holy Sepulchre Church । একজন আরব খ্রীষ্টান অসম্ভব মমতায় ঘুরে দেখালেন পুরো চার্চ । উনার সাথে পথেই পরিচয় কিন্তু উনি থেকে গেলেন হৃদয়ে , সারাজীবনের জন্য । নাম তার জাকারিয়া। খ্রীষ্টান পুরষের নাম জাকারিয়া হতে পারে সেটা জেরুজালেম না গেলে জানলাম না । জেরুজালেম আমাকে নতুন করে জাগিয়েছে । জীবনের মানে যে শুধু বিত্ত বৈভব নয় , জীবনের মানে দামী গাড়ী বাড়ি নয় , জীবনের মানে স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের বৌ বাচ্চা নিয়ে ভালোভাবে বাঁচা নয়। অনেক অনেক কিছু বলার আছে । অনেক গল্প বলতে মন চাচ্ছে কিন্তু ২ সেকেন্ডের বিনোদনের যুগে আমার এতো বড় লেখা নিশ্চয়ই বিরক্তির উদ্রেগ ঘটাবে। তাই আজ এখানেই শেষ করছি । আরো লিখবো জেরুজালেম নিয়ে । আমাকে লিখতে হবেই ..
Posted ০২:৫১ | মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬
Swadhindesh -স্বাধীনদেশ | admin