ওবায়দুল কবীর খোকন | রবিবার, ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট
১ ফেব্রুয়ারি থেকে রুট বন্ধ, হজ ফ্লাইট ও রক্ষণাবেক্ষণকে কারণ দেখাল কর্তৃপক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশিদের ক্ষোভ, লাভজনক রুট বন্ধে সমালোচনা
উড়োজাহাজ সংকট, আসন্ন হজ কার্যক্রম এবং বহর ব্যবস্থাপনার যুক্তি দেখিয়ে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা–ম্যানচেস্টার–ঢাকা রুটে নিয়মিত ফ্লাইট স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই রুটে বিমানের সব ফ্লাইট বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনটির এ সিদ্ধান্ত ঘিরে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ইংল্যান্ডে বসবাসকারী প্রবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই রুট বারবার বন্ধ হওয়ায় বিমানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, উড়োজাহাজের স্বল্পতা, আসন্ন হজ ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি, বিদ্যমান উড়োজাহাজগুলোর দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন এবং পুরো নেটওয়ার্কে বহর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন দক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা–ম্যানচেস্টার রুটে ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এই রুটে যেসব যাত্রী আগাম টিকিট কেটেছেন, তাদের বিমান-এর বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হবে। যাত্রীরা প্রয়োজনে ঢাকা–লন্ডন–ঢাকা রুটে ভ্রমণের তারিখ পরিবর্তনের সুযোগ পাবেন অথবা টিকিটের অর্থ ফেরত নিতে পারবেন। রুটটি পুনরায় চালু হলে যাত্রীদের যথাসময়ে জানানো হবে।
২০২১ সাল থেকে বিমান সিলেট হয়ে ঢাকা–ম্যানচেস্টার রুটে প্রতি সপ্তাহে দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে। এই রুটটি যুক্তরাজ্যের উত্তরাঞ্চলে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির জন্য সরাসরি যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। তবে চালুর পর থেকেই বিভিন্ন সময় উড়োজাহাজ সংকট, হজ ফ্লাইট বা অন্যান্য অজুহাতে একাধিকবার রুটটি স্থগিত করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের হজ কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য ১ মে থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত এই রুটে ফ্লাইট বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিল বিমান। ওই বছরের জুলাই মাসে ৭৩ দিনের বিরতির পর আবার ফ্লাইট চালু করা হলেও এবার আবারও দীর্ঘমেয়াদি স্থগিতের ঘোষণা এলো।
বিমানের এই সিদ্ধান্তে প্রবাসী বাংলাদেশিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে বসবাসরত বিশিষ্ট আইনজীবী মুহাম্মদ চান রহমান জানান, বাংলাদেশ বিমানের ম্যানচেস্টার -সিলেট ফ্লাইটটি বন্ধের সংবাদটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগের । তিনি বলেন, এই ফ্লাইটটি প্রবাসী বাংলাদেশীদের দীর্ঘ দিনের আন্দোলন ও আকাঙ্ক্ষার ফসল ছিল কিন্তু ষড়যন্ত্র মুলকভাবে এই লাভজনক ফ্লাইটটি কেন বার বার বন্ধের ষড়যন্ত্র হয় তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না ।
অবিলম্বে এই ফ্লাইটটি বন্ধের সকল পদক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। এটা প্রবাসীদের ন্যায্য দাবি এবং অধিকার অন্যতায় তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা আমাদের এই অধিকার আদায়ের বদ্ধপরিকর । বর্তমান সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই ফ্লাইট বন্ধের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবী জানাচ্ছি ।
নর্থ ইংল্যান্ডের বাংলাদেশী টিভি রিপোর্টার এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মওদুদ আহমেদ বলেন, প্রবাসীদের ধৈর্যকে আর পরীক্ষায় ফেলা ঠিক হবে না। ঢাকা–ম্যানচেস্টার সরাসরি ফ্লাইট ১ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এই সিদ্ধান্ত শুধু হতাশাজনক নয়, বরং চরম বৈষম্যমূলক ও প্রশ্নবিদ্ধ।
বিমানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—উড়োজাহাজের স্বল্পতা, হজ্ব ফ্লাইট, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি। কিন্তু এই যুক্তি আদতে শুভংকরের ফাঁকি ছাড়া কিছুই নয়। যদি সত্যিই উড়োজাহাজের সংকট থাকে, তাহলে নতুন নতুন রুট চালুর সিদ্ধান্ত আসে কীভাবে? যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িংয়ের আরও ১৪টি এয়ারক্রাফট কেনার সিদ্ধান্তই বা কেন?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন?
-কেন বারবার ম্যানচেস্টার–সিলেট রুটই বন্ধ করা হয়?
-কেন যুক্তরাজ্যের নর্থ-ওয়েস্টে বসবাসরত বাংলাদেশিরাই বারবার টার্গেট হন?
এটা কোনো লোকসানি রুট নয়—বরং অত্যন্ত ব্যবসাসফল ও লাভজনক। টিকিটের দাম ছিল আকাশচুম্বী, তবুও সিট পেতে মানুষ হিমশিম খেত। এমন একটি রুট বন্ধ হলে কার লাভ হচ্ছে—সে প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক। এর পেছনে কোনো দুরভিসন্ধি আছে কি না, সেটাও এখন খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
এই সিদ্ধান্তে যুক্তরাজ্যের নর্থ-ওয়েস্টে বসবাসরত প্রবাসীরা ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই—এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না হলে বিমান বহালের দাবিতে কঠোর আন্দোলন গড়ে উঠবে, এটা অনিবার্য। তিনি বলেন, কাছে বিষয়টি কেবল অব্যবস্থাপনা নয়—এটি প্রবাসে বসবাসরত সিলেটিদের প্রতি অবজ্ঞা ও চরম অবহেলার বহিঃপ্রকাশ।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের কাছে জোরালো দাবি
অবিলম্বে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে ম্যানচেস্টার–সিলেট ফ্লাইট চালু রাখা হোক।
যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বসবাসরত হবিগঞ্জ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মুনতাকিম চৌধুরী বলেন, ম্যানচেস্টার-সিলেট রুটে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ যাত্রী চাহিদা ও লাভজনকতা থাকা সত্ত্বেও বারবার এই রুট স্থগিত করা হচ্ছে, যা প্রবাসীদের জন্য হতাশাজনক।
এই রুটটি বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক এবং টিকিটের মূল্যও তুলনামূলক অন্যান্য এয়ারলাইনসের চেয়ে বেশী। তাঁর মতে, রুটটি বন্ধ হওয়ায় যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে যারা সিলেট অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইটের ওপর নির্ভরশীল।
যুক্তরাজ্যের মান্সফিল্ডে বসবাসরত বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও মান্সফিল্ড সাউথ ডিভিশনের কাউন্টি কাউন্সিলর ফয়সল চৌধুরী বলেন, ঢাকা–ম্যানচেস্টার সরাসরি ফ্লাইট ১ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হওয়ায় যুক্তরাজ্যের নর্থ, নর্থ-ওয়েষ্ট তথা যুক্তরাজ্যের অর্ধেকের চেয়ে বেশী এলাকার বাংলাদেশী সাধারন জনগনপর ভোগান্তিতে পড়তে হবে।
তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশ বিনির্মানে কার্যকরী ভূমিকা রেখে চলেছেন তাদের কথা চিন্তা না করে মন্ত্রনালয়ে বসে এই অমূলক সিদ্ধান্ত লক্ষ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশীর হৃদয়ে আগাত করেছে।
তিনি এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি আহবান জানান।
বিকল্প নেই যাত্রীদের
সিলেট হয়ে ম্যানচেস্টার রুটে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করা একমাত্র এয়ারলাইন হলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। অন্য এয়ারলাইনসে ভ্রমণ করলে যাত্রীদের এক বা একাধিক ট্রানজিট নিতে হয়, যা ভ্রমণের সময় ও খরচ বাড়িয়ে দেয়। ফলে এই রুট বন্ধ থাকায় প্রবাসী যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বহর সংকট ও সক্ষমতা প্রশ্নে বিমান
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এসব উড়োজাহাজ দিয়ে সংস্থাটি ২১টি আন্তর্জাতিক এবং সাতটি অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তবে নিয়মিত রুট স্থগিতের ঘটনায় বিমানের বহর ব্যবস্থাপনা, রুট পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যাত্রী চাহিদা ও লাভজনকতা থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুট বারবার বন্ধ হওয়া বিমানের প্রতি যাত্রীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে। একই সঙ্গে এটি প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
লেখক : আইনজীবী ও সাংবাদিক
ইমেইল : obaydulkabir@hotmail.com
Posted ২৩:৫৯ | রবিবার, ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
Swadhindesh -স্বাধীনদেশ | admin